জমজম কূপের অজানা রহস্য

বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের কাছে জমজমের পানি অতি বরকতময়। হাজার হাজার বছর আগে থেকে শুরু হয়ে আজও পর্যন্ত প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই পানি ব্যবহার করছে। বৈজ্ঞানিকভাবে জমজমের পানি পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ পানি হিসেবে স্বীকৃত। জমজম কুপ নিয়ে বিশ্বের খ্যাতনামা গবেষকরা অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের গবেষণায় জমজমের পানির উপকারীতা পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পানি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। 21 মিটার দূরত্বে অবস্থিত জমজম কূপ। এই কূপের অবস্থান মসজিদুল হারামের অবস্থিত। হাদিসের কথা উল্লেখ রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাম এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জমজম কূপের পানি। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম  বলেন, জমজমের পানি বরকতময়, স্বাদ অন্বেষণকারীর খাদ্য। মা আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের সঙ্গে পাত্রে ও মশকে করে জমজমের পানি বহন করতেন।  যদি কেউ অসুস্থ হতো তাদের মাঝে পানি ছিটিয়ে দেওয়া হতো এবং তাদের পান করানো হতো।

জমজম কূপের অজানা রহস্য

জমজম কূপের পানির বর্তমানে বিজ্ঞান দাঁড়াও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত, জমজমের পানি পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পানি। শুধু তাই নয় এর সমমান পানি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাধারণত যে কোন কূপের পানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে তার রঙ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু হাজার হাজার বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও জমজমের পানি রয়েছে অবিকৃত। বিশুদ্ধতায় সামান্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। শুধু তাই নয় এই পানিতে কোন জীবাণু শৈবাল ছত্রাক বা পানি দূষণ কারী কোন ধরনের বস্তু টিকতে পারেনা। কোন নদীর সঙ্গে এই কুপের কোন সংযোগ নেই অথচ প্রতিমুহূর্তে লাখ লাখ মানুষ এই পানি ব্যবহার করছে। আবার সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে। তবুও জমজম কূপের পানি কখনো শেষ হয় না। জমজমের পানি নিয়ে এখনো পর্যন্ত বহু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে সৌদি আরবের জিওলজিক্যাল সার্ভে রিসার্চ সেন্টার নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে যার কাজ হলো জমজমের পানি নিয়ে গবেষণা করে দেখা। এ গবেষণায় সাধারণ পানির তুলনায় জমজমের পানিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম সল্ট এর পরিমাণ সামান্য বেশি। ক্লান্তি দূর করতে বিরাট ভূমিকা রাখে।

ব্রিটিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। জমজমের পানি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য শক্তি বর্ধক হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি জাপানি গবেষক জমজমের পানি গবেষণা করে বলেছেন এক ফোঁটা পানির গুনাগুন আছে তা পৃথিবীর অন্য কোন পানিতে নেই। তার গবেষণায় আরও দেখা যায়, পৃথিবীর সাধারণের তুলনায় জমজমের পানি 1200-1400 যদি একফোঁটা জমজমের পানি মেশানো হয় তাহলে সেই সাধারণ পানিও জমজমের পানির মত বিশুদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ সাধারণ যে কোন প্রাণীর সাথে জমজমের পানি মেশালে সেই পানীয় জমজমের পানির গুণাগুণ অর্জন করে। অন্য কোন প্রাণীতে ধরনের আচরণ লক্ষ্য করা যায় না। জার্মান বিজ্ঞানী গবেষণা মতে জমজমের পানি আশ্চর্যজনকভাবে দেহের সিস্টেমের শক্তির মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। পানি বিশেষজ্ঞ ডক্টর ইয়াহিয়াকে জমজম কূপের পানির বিশুদ্ধতা নির্ণয় করার জন্য আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি পরীক্ষা চালিয়েছেন। এই পরীক্ষার পর তিনি বলেন জমজমের পানিতে কোন ধরনের দূষণকারী পদার্থ খুঁজে পাওয়া যায়নি। জমজমের পানিতে ফ্লুরাইডের উপস্থিতি থাকার কারণে এই পানির জীবানুনাশক ক্ষমতা রয়েছে।

জমজমের পানি থেকে বিশুদ্ধ পানির প্রতি লিটারে বাই কার্বনেট এর পরিমাণ 357 মিলিগ্রাম এবং জমজমের পানির প্রতি লিটারে বাই কার্বনেট এর পরিমাণ 366  মিলিগ্রাম। জমজম কূপের পানির রাসায়নিক গঠন প্রকৃতি এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া গ্যাস্ট্রিক আলসার গঠিত বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণ করে। জমজম কূপের গভীরতা মাত্র একশ। কূপের পানির স্তর মাটি থেকে প্রায় সাড়ে দশ ফুট নিচে দুটি বিশাল আকারের পানির পাম্পের সাহায্যে প্রতি সেকেন্ডে 100 লিটার থেকে 450 লিটার পর্যন্ত পানি উত্তোলন করা হয়। পানি উত্তোলন করার পরও 44 নিচে নেমে যায় কিন্তু পানি উঠানো বন্ধ করার মাত্র 11 মিনিট পরেই আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসে। প্রতিদিন মক্কা মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববী থেকে প্রায় 20 লক্ষ গ্লাস জমজমের পানি পান করা হয়। জমজমের পানির চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকায় পানি সরবরাহের সৌদি কর্তৃপক্ষ রীতিমত হিমশিম খায়। তাই এলাকায় জমজমের পানি সরবরাহের জন্য বিশাল এক প্রকল্প তৈরি করা হয়।

সৌদি আরবসহ বিশ্বের অন্য প্রান্তে জমজমের পানি পৌঁছে দেয়ার জন্য এখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমজমের পানি বোতলজাত করা হয়। এখান থেকে প্রতিদিন 1 লক্ষ 50 হাজার লিটার পানি সরবরাহ করা। কিন্তু হজের মৌসুমে এই পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় দৈনিক চার লক্ষ লিটারে এই প্রকল্প থেকে প্রতিদিন প্রায় 15 লক্ষ বোতল জমজমের পানি সংরক্ষণ করা হয়। এখান থেকে পরবর্তীতে  ট্যাংকের মাধ্যমে পরিবেশন করা হয়। মদিনার মসজিদে নববী সৌদি আরবের অন্যান্য স্থানে জমজমের পানি পৌঁছে দেয়া হয়। কিছু কিছু স্থানে জমজমের পানি শীতলীকরণ পরিবেশন করা হয়। দর্শনার্থীরা যাতে নিজেদের প্রয়োজনে জমজমের পানি নিয়ে যেতে পারে সে জন্য রয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। এছাড়া মসজিদের মুসল্লিদের সুবিধার্থে স্বেচ্ছাসেবক জমজমের পানি পান করে সরাসরি পরিদর্শন করে। সেই সাথে বিভিন্ন ছোট ছোট বোতলজাত পানি সরবরাহ করা হয়। সৌদি আরব দেশে বাণিজ্যিকভাবে জমজমের পানির মজুদ ও কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অসংখ্য কর্মী সাধারণ মানুষের কাছে জমজমের পানি পৌঁছে দেওয়া এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

জমজমের পানি সম্পর্কে অনেক আলোচনা হল। এবার জমজম কূপ সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে জানা যাক। আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও ইসমাইল আলাইহিস সালামকে পাহাড়ি এলাকায় নির্বাসনে রেখে আসেন। আল্লাহর আদেশ মোতাবেক সবচেয়ে প্রিয় কোন কিছুর কোরবানি। এক মশক পানি ও এক থলে খেজুর সহ ছেলে ইসমাইল আলাইহিস সাল্লাম সহ তাদেরকে বিরান মরুভূমিতে রেখে তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করেন। ফলে মক্কার বালুময় প্রান্তরে একাকী বসবাস করতে থাকেন মা হাজেরা ও তার শিশু ইসমাইল তাদের অতি দ্রুত ফুরিয়ে যায়। একদিন নিদারুণ পানির পিপাসায় শিশুকে খোলা প্রান্তরে সাফা মারওয়া পাহাড়ের ছোটাছুটি করতে থাকেন। তিনি সাতবার এদিক থেকে ওদিকে দৌড়ে দাঁড়ান। একপর্যায়ে আল্লাহর হুকুমে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মরুভূমির ভেতর থেকে পানির ঝর্ণা প্রবাহিত করে দেন।  মা হাজেরা ইসমাইল আলাইহিস সালাম এর কাছে এসে দেখেন এক অভূতপূর্ব ঘটনা। শিশুপুত্র ইসমাইলের পায়ের নিচে তৈরি হয়েছে বিশুদ্ধ পানির স্রোত। তখন মা হাজেরা বাঁধ দিয়ে বললেন জামজাম অর্থাৎ থেমে যাও। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত বহাল রয়েছে জমজমের পানি এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে বলে মুসলিমদের দৃঢ় বিশ্বাস।


শেয়ার করুন