ভয়ংকর এক মহামারি আসছে !

পৃথিবীতে এক নিরব মহামারি'র ছড়িয়ে পড়েছে। ভয়ঙ্কর এই মহামারীর নাম অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স। আমাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক আর আগের মতো কাজ করছে না। যে সমস্ত জীবাণু ঘটিত রোগের কারণে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক খেতাম এখন সেসব জীবাণু এন্টিবায়োটিক ঔষধের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রত্যক্ষভাবে প্রায় 13 লক্ষ মানুষ মারা গেছে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় 50 লক্ষ লোকের মৃত্যুর জন্য এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স কে দায়ী করা হচ্ছে। সাধারণতঃ ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগের ক্ষেত্রে আমরা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করি। ব্যাকটেরিয়া হল এক ধরনের অনুজীব অতি ক্ষুদ্র প্রাণী। আমাদের চারপাশে সর্বত্রই ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে রয়েছে। আমাদের শরীরে প্রচুর ব্যাকটেরিয়া আছে। এমনকি একজন মানুষের শরীরে যত যাচ্ছে তার চেয়ে প্রায় 10 গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া আছে। এসব ব্যাকটেরিয়ার অধিকাংশই ক্ষতিকর নয়। বরং ব্যাকটেরিয়া আমাদের জন্য উপকারী। কিছু ব্যাকটেরিয়া আমাদের খাদ্য হজমে সহায়তা করে। আবার কিছু আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কিছুতেই ক্ষতিকর থেকে শুরু করে প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে এ ধরনের ইনফেকশন দূর করতে অনেক ধরনের ঔষধ তৈরি করা হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক মানব দেহের ক্ষতি না করেই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আবিষ্কারের ফলে অনেক মারাত্মক রোগের চিকিৎসা খুব সহজ হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে।এর কারণ হলো ব্যাকটেরিয়াগুলো আগের চেয়ে বেশি শক্তি অর্জন করেছে।

ভয়ংকর এক মহামারি আসছে !

তোমার সাথে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ব্যাকটেরিয়ার দৈহিক গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে প্রচলিত এন্টিবায়োটিক ঔষধ দিয়ে এসব ব্যাকটেরিয়া কে কাবু করা যাচ্ছেনা। ব্যক্তিগত জীবনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠাই বলা হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স 1929 সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেছিলেন। সেটি ছিল সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক। বর্তমানে আমাদের পুরো চিকিৎসাব্যবস্থা এন্টিবায়োটিক এর উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু গত 30 বছরে নতুন কোন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়নি। তবে এর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া অনেক বেশি ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে। অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে প্রবেশ করে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে থাকে। কিন্তু ব্যাকটেরিয়াগুলো আবার বেঁচে থাকার জন্য ক্রমাগত বিকশিত হয়। আমরা যত বেশি অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করি ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একপর্যায়ে রোগের জীবাণু গুলো সুপারবাগ এ পরিণত হয়। যাদেরকে কোনোভাবেই দমন করা সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের উপলব্ধির চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সমস্যাটির বিশালতা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা চারটি দেশে এই গবেষণা চালান 49 কোটি 40 লাখ রোগীর সমস্ত তথ্য যাচাই করে গবেষণার ফলাফল তৈরি করা হয়েছে।

গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স এর 2019 সালের 12 লাখ 70 হাজার মানুষ মারা গেছে এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স আরো প্রায় 50 লাখ মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল এবং রোগীদের থেকে নেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে শিশুরা। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এর মৃত্যু হয়েছে তাদের প্রতি পাঁচজনে একটি শিশু। যাদের বয়স পাঁচ বছরেরও কম। গবেষণার ফলাফলের উল্লেখযোগ্য দুটি দিক হল সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে দক্ষিণ এশিয়া এবং সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের দেশগুলোতে। এসব অঞ্চলে প্রতি এক লক্ষ মানুষের মধ্যে 24 জন মারা গেছে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম মৃত্যু ঘটেছে বেশি আয়ের দেশগুলোকে সেখানে প্রতি এক লোকের মধ্যে 13 জন মারা গেছে। এই গবেষণায় সারাবিশ্বে বাটিকের প্রভাব কমে যাওয়ার প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে। গবেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে 2050 সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু গুলোর কারণে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যাবে। ছোটখাটো এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার অনেকেই দেখা যায় এমন সামান্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে এমনিতেই সেরে যাওয়ার কথা ছিল। সাধারণ এন্টিবায়োটিক নেওয়ার কারণে মারাত্মক অসুখের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক এর কার্যকারিতা কমে যায়। সাধারণত একজন চিকিৎসক রোগীর অবস্থা বুঝে পাঁচ থেকে সাত দিনের অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। কিন্তু অনেক সময় রোগের ঔষধ খাওয়ার পর সুস্থ বোধ করলে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দেয় তখন ওই এন্টিবায়োটিক রোগীর শরীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে রোগীর আগের চেয়ে বেশি মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দরকার হয়। এমনকি এক পর্যায়ে রোগীর শরীরে আর কোন এন্টিবায়োটিক কাজই করেনা।

মানুষের শরীরে এন্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার অথবা এন্টিবায়োটিক কোর্স শেষ না করলে ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়া সহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত তবে এন্টিবায়োটিক দেওয়ার আগে রোগের কারণ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া অনেকেই ডাক্তারকে অ্যান্টিবায়োটিক লেখার জন্য জোরাজুরি করে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবারা প্রায়ই এই কাজটি করে। অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের আগে অবশ্যই এন্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যাচাই করে নেয়া উচিত। বাংলাদেশের বিনা প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। চিকিৎসাসংক্রান্ত কারণ ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি বিষয় বাংলাদেশের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলেছে এবং শাকসব্জি চাসের কৃষিকাজে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার আমাদেরকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন শরীরকে নিরাপদ রাখার জন্য  অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার অনেক বেড়েছে। প্রতিদিন প্রায় 15 থেকে 20 কোটি মুরগির খাবারের সাথে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো হচ্ছে। এর ফলে মুরগির থেকে মানুষের শরীরে এন্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে পরবর্তীতে সমগ্র ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে আক্রমণ করলে তার নিরাময় কোন ওষুধ কাজে আসছে না। বাংলাদেশের কার্যকারিতা নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু কে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে এগুলো হলো

  • মাল্টিপল ট্রাক রেসিডেন্ট
  • এক্সটেন্সিভ রেজিস্ট্যান্স
  • পেনড্রাইভ রেজিস্টেন্স

এমন জীবাণুর বিরুদ্ধে কোন এন্টিবায়োটিক কি কাজ করে না। শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান। ধারাবাহিকভাবে গত 15 বছর থেকে দেখা যাচ্ছে দেশের অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। পাঁচ থেকে দশ বছর আগে খুবই কার্যকর ছিল। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের এক গবেষণায় উঠে এসেছে। দেশে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক এর মধ্যে অন্তত অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা অনেকাংশে কমে গেছে। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং প্রথম আবিষ্কার 945 সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি তার নোবেল পুরস্কার গ্রহণে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এর বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং বলেন, এমন এক সময় আসতে পারে যখন দোকানে যে কেউ চাইলেই পেনিসিলিন কিনতে পারবে। তারপরে বিপদ ঘটবে যখন কোন ব্যক্তি পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে তার জীবাণুগুলোকে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

বাংলাদেশের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিষেধ। তারপরও বিভিন্ন ফার্মেসিগুলো প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করছে। বাংলাদেশের প্রায় দুই থেকে আড়াই লক্ষ ফার্মেসি আছে। এই দিনে অন্তত পাঁচটি করে এন্টিবায়োটিক দেয় তাহলে দেখা যায় যে, প্রতিদিন তারা 10 থেকে 15 লক্ষ অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করছে। এগুলোর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক মানুষের এই অ্যান্টিবায়োটিক এর প্রয়োজন আছে। সেজন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসক ছাড়া অন্য কারো পরামর্শ ব্যবহার করা কিছুতেই উচিত নয়। সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী এন্টি পক্স ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাদুর্ভাব কে বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের জন্য আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। যে কোন ধরনের রোগের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এটি সর্বোচ্চ সত্যতা এখনো পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশের প্রায় 16 হাজার মানচিত্র ধরা পড়েছে।


শেয়ার করুন