বাংলাদেশের জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২

জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা এখন সাড়ে 16 কোটি। কিন্তু বিশেষজ্ঞসহ অনেকের কাছেই এই তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। এমনকি সরকারি নানা পরিসংখ্যানের সাথেও এই হিসাবের কোন মিল নেই। জন্ম নিবন্ধন এবং ভোটার সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় 18 কোটি। যদিও পরিসংখ্যান বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে আগের সকল তথ্য অনুমাননির্ভর এবং এবারের তথ্যনির্ভর। অথচ জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 শেষ হওয়ার পর স্বয়ং পরিকল্পনামন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন জনশুমারির কাজে অবহেলা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মূল ধারার গণমাধ্যমেও দাবি করেছে তাদের বাড়িতে কোন গণনা কর্মী যায়নি এবং তারা গনণা মধ্যেও আসেনি। জনশুমারি ও গৃহগণনা 2020 এর প্রতিবেদনের তথ্য অনেকের কাছেই অবাস্তব মনে হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গণনা কর্মীরা বাসা বাড়িতে যাননি। কোন কোন ভাষায় গণনার কাজ না করেই দরজায় শুধু স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। গণনা থেকে বাদ পড়া অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২

এছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও অনেক গণনা থেকে বাদ পড়ার তথ্য দিচ্ছেন। তবে পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে গণনার বাইরে তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। জনশুমারি ও গৃহগণনা 2020 এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা এখন 16 কোটি 51 লাখ 58 হাজার 616 জন। অথচ 2020 সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এক প্রতিবেদনে জানায় দেশের জনসংখ্যা 16 কোটি 91 লাখ 1 হাজার। দুই বছর আগের চেয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত জনশুমারি দেশের জনসংখ্যা প্রায় 40 লাখ কম। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্ম মৃত্যু নিবন্ধন এর হিসাব বলছে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে জন্ম নিবন্ধন এর মোট সংখ্যা ছিল 18 কোটি 59 লাখ 39 হাজার 400 জন। মৃত্যু নিবন্ধন এর সংখ্যা মাত্র 8 লক্ষ 85 হাজার সেই হিসেবে। মোট জনসংখ্যা 18 কোটির উপরে হওয়ার কথা বাংলাদেশ ভোটার সংখ্যা 11 কোটি 32 লাখ সরকারি হিসেবে। শিশুর সংখ্যা ছয় কোটি 60 লক্ষ এক্ষেত্রেও মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় 18 কোটি কাছাকাছি। কিন্তু এসব হিসেব পরিসংখ্যান ব্যুরো মানতে নারাজ।

2011 সালের আদমশুমারিতে দেশের জনসংখ্যা উঠে আসে 14 কোটি 23 লাখ পরবর্তীতে তার সংশোধন করে হয়। 15 কোটির কাছাকাছি সরকারি হিসাব মতে প্রতি বছর প্রায় 25 লক্ষ লোক দেশের জনসংখ্যা যোগ হচ্ছে। সেই হিসেবে গত 10 বছরে জনসংখ্যার বৃদ্ধি সহ বর্তমানে দেশে সাড়ে 17 কোটি লোক থাকার কথা। অতীতের জনশুমারি গুলো থেকেও লক্ষ্য করা যায় যে প্রতি 10 বছর পর পর দেশের জনসংখ্যা গড়ে প্রায় দুই কোটি করে বেড়েছে। এবারের জনশুমারি প্রস্তুতি বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড শামসুল আলম বলেছিলেন, এবার দেশের জনসংখ্যা 17 কোটি হতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক ফলাফল এ ধারণার চেয়েও অনেক কম জনসংখ্যার তথ্য উঠে এসেছে। দেশের জনসংখ্যার মতো রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছেও জনসংখ্যা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। সেজন্য সিটি কর্পোরেশন গুলো এবারের জনশুমারি তথ্যের দিকে তাকিয়েছিল। সাম্প্রতিক জার্মানির রাজধানীর জনসংখ্যা নিয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা অনেকটা অবাস্তব বলে মনে করছেন।

অনেকে জনশুমারি প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের জনসংখ্যা 59 লাখ 79 হাজার 500 জন। এদের বেশিরভাগই থাকেন ঢাকায় ঢাকায় বস্তিবাসীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে 8 লাখ 84 হাজার। অন্যদিকে দেশের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা 22 হাজার 185 জন। ভাসমান জনগোষ্ঠীর অধিক সংখ্যক লোক ঢাকায় রয়েছে। ঢাকাতে প্রায় 9 হাজার 470 জন ব্যক্তিকে ভাসমান জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় বস্তিবাসী এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীর এর চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এ ধরনের গরমিল হিসেবে নগর পরিকল্পনায় মারাত্মক সমস্যা তৈরি হবে। সরকারি হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি 20 লাখ মানুষ দেশের বাইরে প্রবাসী হিসেবে রয়েছেন। তথ্য সংগ্রহের প্রশ্নপত্রের পরিবারের প্রবাসী ব্যক্তিদের সম্পর্কে প্রশ্ন ছিল যেমন একটি পরিবারে কতজন বাংলাদেশী নাগরিক বিদেশে থাকেন? গত দুই বছরে কতজন সদস্য বিদেশ থেকে স্থায়ীভাবে ফেরত এসেছেন এবং দুই বছরের পরিবারে কোন বৈদেশিক রেমিটেন্স গ্রহণ করা হয়েছে কিনা এইসব তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রবাসী জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিনা সে বিষয়টিও এখনো পর্যন্ত অনিশ্চিত জনশুমারি সবসময় শুষ্ক মওসুমে পরিচালিত হয় এবার এই প্রথম বর্ষ গণনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

অতিবৃষ্টি বন্যার কারণে গণনা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। 15 থেকে 21 জুন পর্যন্ত জনশুমারি হওয়ার কথা থাকলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলায় বন্যা হওয়ার কারণে বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে 28 জুন পর্যন্ত শুমারি কার্যক্রম চলেছে। চলাকালীন সময়ে প্রায় 50 লাখ মানুষ বন্যাকবলিত ছিল বন্যায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় গণনা কর্মীরা তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনমতো বাড়ি বাড়ি যেতে পারেননি। তাই বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ সঠিকভাবে গণনার আওতায় এসেছে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ডিজিটাল আদমশুমারিতে দেশের জনসংখ্যার যথার্থ চিত্র উঠে আসবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে গণনা কার্যক্রমে গাফিলতির কারণে অনেকেই গণনা থেকে বাদ পড়েছেন। মূলত এই কারণেই এবারের প্রতিবেদনে এ তথ্য বিভ্রাট হয়েছে জনশুমারির কাজে অবহেলা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। জনশুমারি তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুমারি কর্মী হিসেবে সারা দেশে প্রায় তিন লক্ষ 70,000 গণনাকারী কাজ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন এইচএসসি পাস করার ছেলেমেয়েদের দিয়ে এই কাজটি করানো হয়েছে। তাদের অনেকেই কাজে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৃতীয় পক্ষ হিসেবে শুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদনের তথ্য যাচাই করবে। এতে দেশের জনসংখ্যা আরো অন্তত 4 শতাংশ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগের জনশুমারি গুলোতে একইভাবে প্রাথমিক প্রতিবেদন এর চেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জনসংখ্যা বেড়ে। আগামী তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে। জনসংখ্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন জনসংখ্যা গণনা গুলবাহার 5 শতাংশের নিচে থাকলে তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জনশুমারি তে কত শতাংশ লোক গণনা থেকে বাদ পড়েছে তার সঠিক হিসেব কেউ বলতে পারবেনা। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন সহ যে কোন নীতি নির্ধারণ বা কৌশল অবলম্বনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার প্রকৃত তথ্য অত্যন্ত জরুরী। এর ভিত্তিতেই দেশের মোট খাদ্যসহ সমস্ত পণ্যের চাহিদা নিরুপন সরবরাহ ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়। জনসংখ্যার সঠিক তথ্যের অভাবে এ ধরনের যে কোন পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে জনসংখ্যার হেরফের কারণে মাথাপিছু আয় অনেক বেড়ে যাবে। এ কারণে বিদেশি সহায়তার ঋণ ও অনুদান ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সুবিধার ক্ষেত্রেও দেশকে বেকায়দায় পড়তে হবে। জনসংখ্যা কম দেখানোর কারণে মাথাপিছু আয় বেড়ে গেলে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া কঠিন হবে। সরাসরি ডিজিটাল পদ্ধতিতে গণনা করা হয়, এবারের শুমারিতে ভুল হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু শুমারি কর্মীদের গাফিলতি এবং কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারির অভাবে 1575 কোটি টাকা ব্যয়। পরিচালিত এই ফলাফলের বিরাট গরমিল দেখা যাচ্ছে।


শেয়ার করুন